ওয়েব ডেস্ক: একটা নয়, দুটো নয়—আটটি গ্রহকে নিয়ে সূর্যের ভরাট সংসার। পৃথিবীর মতো বাকি গ্রহগুলিও সূর্যের টানে তার চারপাশে ঘুরে চলেছে নিরন্তর। এটাই মহাবিশ্বের চিরাচরিত নিয়ম। তবে নিয়মের ব্যতিক্রম যে রয়েছে, তা বারবার প্রমাণ করেছে বিজ্ঞান। নক্ষত্রের আকর্ষণ ছাড়াই মহাশূন্যে ঘুরে বেড়ানো ‘বিচ্ছিন্ন’ বা একলা গ্রহের অস্তিত্ব আগেও মিলেছিল। কিন্তু এ বার প্রথম বার এমন এক গ্রহের ভর ও দূরত্ব নির্ভুল ভাবে পরিমাপ করলেন বিজ্ঞানীরা—যা মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
পৃথিবী থেকে সদ্য আবিষ্কৃত এই গ্রহটির দূরত্ব প্রায় ৯,৭৮৫ আলোকবর্ষ। এর ভর বৃহস্পতির ভরের প্রায় ২২ শতাংশ। আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান এই বিচ্ছিন্ন গ্রহটির। একাধিক টেলিস্কোপে তার নক্ষত্রহীন অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছেই—কেন এই গ্রহ একা? বিজ্ঞানীদের অনুমান, অন্য গ্রহগুলির মতোই কোনও এক নক্ষত্রের চারপাশে তার জন্ম হয়েছিল। পরে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ-বিকর্ষণের জটিল খেলায় একসময় নক্ষত্রের টান থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায় সে। সেই থেকেই একা একাই মহাশূন্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে—এক প্রকার মহাজাগতিক নির্বাসন।
আকারে তুলনামূলক ছোট এবং নিজস্ব আলো না থাকায় এই গ্রহকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। কোনও নক্ষত্রের সঙ্গ না থাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে তাকে শনাক্ত করা যায় না। তাই বিজ্ঞানীদের ভরসা ‘গ্র্যাভিটেশনাল মাইক্রোলেন্সিং’ পদ্ধতি। যখন গ্রহটি পৃথিবী ও কোনও দূরবর্তী নক্ষত্রের মাঝখানে এসে পড়ে, তখন তার মহাকর্ষীয় প্রভাব লেন্সের মতো কাজ করে এবং নক্ষত্রের আলো ক্ষণিকের জন্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেই আলো বিশ্লেষণ করেই গ্রহটির অস্তিত্ব ধরা পড়ে।
তবে শুধু অস্তিত্ব নয়, ভর ও দূরত্ব মাপাই ছিল আসল চ্যালেঞ্জ। কারণ তার জন্য গ্রহটির সঠিক অবস্থান জানা জরুরি। সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন বিজ্ঞানীরা।
২০২৪ সালের ৩ মে চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত ভূমি-ভিত্তিক টেলিস্কোপ এবং পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরের কক্ষপথে থাকা গাইয়া স্পেস টেলিস্কোপ—এই দুই ভিন্ন অবস্থান থেকে গ্রহটিকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রায় ১৬ ঘণ্টায় ছ’বার গ্রহটির ছবি ধরা পড়ে। এই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই দূরত্ব ও ভর নির্ণয় সম্ভব হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, এই পদ্ধতি আগামী দিনের গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ২০২৭ সালে উৎক্ষেপণ হতে চলা ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ এই কাজে নতুন গতি আনবে। দাবি বিশেষজ্ঞদের, হাব্ল টেলিস্কোপের তুলনায় প্রায় ১,০০০ গুণ দ্রুতগতিতে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হবে এই নতুন টেলিস্কোপ, ফলে বিচ্ছিন্ন গ্রহ নিয়ে গবেষণা আরও সহজ হবে।
এই যুগান্তকারী গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ।




