ওয়েব ডেস্ক: প্রায় সাত বছর পর এক প্রকাণ্ড গ্রহাণুর সঙ্গে সংঘর্ষের মুখে পড়তে পারে চাঁদ। পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহের এই সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে মহাকাশবিজ্ঞানীদের মধ্যে। এখনও নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা না গেলেও, সংঘর্ষ হলে ভয়াবহ বিস্ফোরণের আশঙ্কা প্রবল। সেই বিস্ফোরণের ঝলকানি পৃথিবী থেকেও দেখা যেতে পারে বলে দাবি বিজ্ঞানীদের। মহাকাশে তাক করে রাখা একাধিক শক্তিশালী টেলিস্কোপের তথ্য বিশ্লেষণ করেই এই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। সময় যত এগোচ্ছে, গ্রহাণুটির গতিপথ ও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ ও নজরদারি ততই বাড়ছে।
পৃথিবী ও চাঁদের দিকে ধাবমান এই গ্রহাণুটির সন্ধান প্রথম পাওয়া যায় ২০২৪ সালে। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘২০২৪–ওয়াইআর৪’ (Asteroid 2024 YR4)। প্রথমদিকে আশঙ্কা করা হয়েছিল, গ্রহাণুটি সরাসরি পৃথিবীতেই আছড়ে পড়তে পারে। সে সময় সেই সম্ভাবনা ছিল প্রায় ৩.১ শতাংশ। তবে পরবর্তী পর্যবেক্ষণে পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা কমেছে এবং চাঁদের সঙ্গে ধাক্কার সম্ভাবনা বেড়েছে। বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩২ সালে ওয়াইআর৪-এর সঙ্গে চাঁদের সংঘর্ষের সম্ভাবনা প্রায় ৪ শতাংশ।
এই সম্ভাব্য সংঘর্ষ ঘিরে একাধিক আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, ধাক্কা লাগলে চাঁদের বুকে প্রবল বিস্ফোরণ ঘটবে এবং তার ফলে বহু ছোট উল্কাপিণ্ড ছিটকে পৃথিবীর দিকে আসতে পারে। এতে পৃথিবীর কৃত্রিম উপগ্রহগুলির ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হবে। যদিও আপাতত এই ধরনের ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর দিকে আসার আশঙ্কা মাত্র ১ শতাংশ বলে মনে করা হচ্ছে। নাসার ইঞ্জিনিয়ার ব্রেন্ট বার্বির কথায়, “ওয়াইআর৪ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণকারী বিভিন্ন কৃত্রিম উপগ্রহের ক্ষতি করতে পারে। তাই আগাম সতর্কতা জরুরি।”
গ্রহাণুটির সঠিক আকার ও ভর এখনও নিশ্চিত নয়। তবে প্রাথমিক গবেষণা বলছে, গ্রহাণুটির প্রস্থ অন্তত ৬০ মিটার হতে পারে। যদি সত্যিই ২০৩২ সালের ২২ ডিসেম্বর চাঁদের সঙ্গে তার সংঘর্ষ ঘটে, তবে বিস্ফোরণের তীব্রতা হতে পারে জাপানের হিরোশিমায় পরমাণু বিস্ফোরণের চেয়েও প্রায় ৪০০ গুণ বেশি। বিজ্ঞানীদের অনুমান, প্রায় ৬০ লক্ষ মেট্রিক টন টিএনটির সমান শক্তি ওই বিস্ফোরণ থেকে নির্গত হতে পারে।
চাঁদের কোন অংশে এই সম্ভাব্য ধাক্কা লাগতে পারে, তা নিয়েও হিসাব কষেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, চাঁদের যে দিকটি পৃথিবীর দিকে মুখ করে রয়েছে, সেই অংশে সংঘর্ষের সম্ভাবনা প্রায় ৮৬ শতাংশ। সে ক্ষেত্রে পৃথিবী থেকে চাঁদের বুকে বিস্ফোরণের এক ঝলকানি দেখা যেতে পারে। যদিও তা স্থানীয় আবহাওয়া, মেঘাচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য তাৎক্ষণিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে। মার্কিন মহাকাশবিজ্ঞানী প্যাট্রিক কিং জানিয়েছেন, পৃথিবী থেকে এই আলোকঝলক দেখার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই বিরল দৃশ্য দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে হাওয়াই ও সংলগ্ন দ্বীপপুঞ্জ এবং আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তের বাসিন্দারা চাঁদের বিস্ফোরণের ঝলকানি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেতে পারেন। তবে আপাতত সবই অনুমানের স্তরে রয়েছে। কারণ, সংঘর্ষের বহু আগেই গ্রহাণুটিকে মহাকাশেই ধ্বংস করে দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে।
গ্রহাণুটির সঠিক আকার ও ভর জানা গেলে তাকে পথিমধ্যেই ধ্বংস করার চেষ্টা করতে পারবেন বিজ্ঞানীরা। সেই লক্ষ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে ওয়াইআর৪-কে পর্যবেক্ষণ করার কথা রয়েছে। তখন আরও নির্ভুল তথ্য মিলবে বলে আশা।
মহাকাশেই গ্রহাণু ধ্বংস করার একাধিক উপায় নিয়ে ভাবনা চলছে। ব্রেন্ট বার্বির মতে, শক্তিশালী কোনও বস্তু পাঠিয়ে গ্রহাণুটিকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। এমনকি মহাকাশে নিয়ন্ত্রিত পরমাণু বিস্ফোরণের মাধ্যমেও গ্রহাণু ধ্বংস সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত নিখুঁত গণনা। বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের সঙ্গে সংঘর্ষের অন্তত তিন মাস আগে গ্রহাণুটিকে ধ্বংস করতে পারলেই তার ধ্বংসাবশেষ পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছবে না। এই হিসাবের সামান্য ভুলচুকও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তাই আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই বিষয়ে বিশেষ মহাকাশ অভিযান পাঠানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন গবেষকেরা।




