স্পোর্টস ডেস্ক: চার দিনের ভারত সফর নিয়ে সমাজমাধ্যমে আগেই মুখ খুলেছিলেন। তবে যুবভারতী কাণ্ডের প্রায় এক মাস পরে এই প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারে কথা বললেন লিয়োনেল মেসি (Lionel Messi)। আর্জেন্টিনার স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল ‘লুজু টিভি’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক জানালেন, তিনি হট্টগোল একেবারেই পছন্দ করেন না। একই সঙ্গে স্পষ্ট করলেন, তাঁর প্রতিটি দিন নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় বাঁধা। সেই পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটলে তিনি মানসিক ভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েন।
সাক্ষাৎকারে সরাসরি ভারত সফর বা যুবভারতীর ঘটনার উল্লেখ না থাকলেও, মেসির বক্তব্যের সঙ্গে সেই দিনের অভিজ্ঞতার স্পষ্ট মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। প্রশ্নকর্তা তাঁকে ভারত সফর নিয়ে কোনও প্রশ্ন না করলেও, ‘হট্টগোল’ ও ‘পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়া’ নিয়ে মেসির মন্তব্য কার্যত যুবভারতীর ঘটনার দিকেই ইঙ্গিত করছে বলে মত ফুটবলমহলের একাংশের।
ইন্টার মায়ামির অধিনায়ক সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁর একাকিত্ব প্রয়োজন। মেসির কথায়, “আমি একটু অদ্ভুত। একা থাকতে ভালোবাসি। একাকিত্ব উপভোগ করি। এমনকি বাড়িতে তিন সন্তানের কোলাহলও মাঝে মাঝে আমাকে ক্লান্ত করে। তখন আমার একা থাকার দরকার হয়।” তিনি আরও জানান, দিনের পরিকল্পনায় আচমকা পরিবর্তন হলে সেটার সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাঁর যথেষ্ট সমস্যা হয়। “আমি খুব গোছানো থাকতে পছন্দ করি। প্রতিটি দিন নির্দিষ্ট ছকে সাজানো থাকে। মাঝপথে কিছু ঘটে যদি সব ওলটপালট করে দেয়, তা হলে সেটা আমাকে সমস্যায় ফেলে,” বলেন মেসি।
এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতেই গত ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতীতে মেসির আচমকা স্টেডিয়াম ত্যাগ করার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ওই দিন মেসি বেরিয়ে যাওয়ার পর গ্যালারিতে শুরু হয় তীব্র বিশৃঙ্খলা। বহু দর্শক মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে টিকিট কেটেও মেসিকে কাছে থেকে দেখতে না পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। চেয়ার ও জলের বোতল ছোড়া হয়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে মেসির সফর কার্যত ভেস্তে যায়। মাঝপথ থেকেই ফিরে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি মেসি ও দর্শকদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন এবং বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের নির্দেশ দেন। দ্রুত গ্রেফতার করা হয় সফরের আয়োজক শতদ্রু দত্তকে, যিনি এখনও পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন।
এই ঘটনার রেশ পড়ে রাজ্য রাজনীতিতেও। ক্রীড়া দফতরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। যুবভারতীকাণ্ডের দায় অনেকটাই তাঁর কাঁধে গিয়ে পড়ে বলে রাজনৈতিক মহলের মত। কারণ, মেসি যুবভারতীতে যে কুড়ি মিনিটের মতো সময় ছিলেন, তার অধিকাংশ সময়ই তাঁকে অরূপ বিশ্বাসের পাশেই দেখা গিয়েছিল। মেসিকে ঘিরে উপস্থিত ছিলেন আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি, তবে মন্ত্রী হিসেবে সামনে ছিলেন মূলত অরূপই। ফলে রাজ্য সরকারও পড়ে যায় অস্বস্তিতে।
এদিকে, ‘লুজু টিভি’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও খোলাখুলি কথা বলেছেন মেসি। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোচ হওয়ার কোনও ইচ্ছা তাঁর নেই। বরং তিনি ক্লাবের মালিক হতে চান। তাঁর লক্ষ্য, তৃণমূল স্তর থেকে ফুটবলার তুলে আনা। মেসির কথায়, “আমি নিজেকে কোচ হিসেবে দেখি না। আমি ক্লাবের মালিক হতে চাই।” এই লক্ষ্য থেকে তিনি খুব একটা দূরেও নন। দীর্ঘদিনের বন্ধু লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে ইতিমধ্যেই উরুগুয়ের চতুর্থ ডিভিশনের ক্লাব দেপোর্তিভো এলএসএম-এর মালিক মেসি। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে মায়ামিতে অনূর্ধ্ব-১৬ প্রতিযোগিতা ‘মেসি কাপ’ও চালু করেছেন তিনি।
হট্টগোলের পাশাপাশি সমাজমাধ্যম নিয়েও নিজের বিরক্তির কথা জানিয়েছেন মেসি। সেখানে ছড়ানো ‘অসত্য’ মন্তব্য নিয়ে তাঁর বক্তব্য, “মানুষ এমন সব কথা বলে, যার সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল নেই। সবার দরজায় গিয়ে সব সময় ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়।” প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রসঙ্গেও প্রশ্ন করা হলে মেসি জানান, তিনি প্রযুক্তিতে খুব স্বচ্ছন্দ নন। চ্যাটজিপিটি-র মতো এআই টুলও তিনি ব্যবহার করেন না। তাঁর কথায়, “আমি এর বিরোধী নই। কিন্তু এখনও ঠিক সড়গড় হয়ে উঠতে পারিনি। আমার স্ত্রী আন্তোনেলা এগুলো অনেক বেশি ব্যবহার করে।”
সব মিলিয়ে আপাতত পুরো মনোযোগ ফুটবলেই। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে আগামী মরসুমের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত মেসি। ভক্তদের আশা, চলতি বছর বিশ্বমঞ্চে আবারও আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে দেখা যাবে তাঁকে।




