ওয়েব ডেস্ক: ১৩ বছর ধরে শয্যাশায়ী ছেলে। মাথা থেকে পা— সম্পূর্ণ অসাড়। সামান্য নড়াচড়ার ক্ষমতাও নেই। বিছানাই ছিল তাঁর একমাত্র আশ্রয়। প্রতিদিন চোখের সামনে ছেলেকে এই অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখছিলেন বৃদ্ধ বাবা-মা। ছেলের যন্ত্রণা, বলতে না-পারা কষ্ট এক মুহূর্তেই বুঝে নিতেন তাঁরা। কিন্তু সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার কোনও পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। দীর্ঘ চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে করতে ক্রমশ নিঃস্ব হয়ে পড়ছিলেন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। প্রায় দু’বছরের আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে রায় এল— তবে সে জয় আনন্দের নয়, শোকের।
বুধবার সুপ্রিম কোর্ট ১৩ বছর ধরে শয্যাশায়ী ৩২ বছর বয়সি হরীশ রানাকে ‘নিষ্কৃতিমৃত্যু’ (প্যাসিভ ইউথানেশিয়া) দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। এই আবেদন করেছিলেন তাঁর বাবা-মা। আইনি লড়াইয়ে জয় এলেও পুত্রকে হারানোর বেদনায় স্তব্ধ পরিবার।
হরীশ ছিলেন চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। কলেজে পড়ার সময় পেয়িং গেস্ট হিসেবে একটি বাড়ির চারতলায় থাকতেন তিনি। প্রাণবন্ত এক তরুণের জীবন আচমকাই থমকে যায় ২০১৩ সালের ২০ অগস্ট, রাখিবন্ধনের দিন। যে বাড়িতে থাকতেন, সেখানকার চারতলা থেকে নিচে পড়ে গুরুতর মাথার আঘাত পান তিনি। প্রাণে বেঁচে গেলেও স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন।
দুর্ঘটনার পর থেকেই বিরল স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন হরীশ। হাঁটা তো দূরের কথা, শরীরের কোনও অংশই নড়াতে পারতেন না। চিকিৎসকদের মতে, তিনি কোয়াড্রিপ্লেজিয়া রোগে ভুগছিলেন। গত ১৩ বছর ধরে তাঁর শরীরের প্রায় ১০০ শতাংশই পক্ষাঘাতগ্রস্ত। এমনকি বাইরের জগৎ বা নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও তাঁর কোনও চেতনা ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে তাঁকে ‘পরোক্ষ মৃত্যু’ দেওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখতে নয়ডা জেলা হাসপাতালে একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মামলার শুনানি হয় শীর্ষ আদালতে। মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বহুস্তরীয় আলোচনার পর রায় স্থগিত রাখা হয়েছিল।
এর আগেই ২০২৪ সালে এই মামলাকে ‘খুব কঠিন সমস্যা’ বলে মন্তব্য করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। অবশেষে বুধবার বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ এই মামলার রায় দেয়।
রায় ঘোষণার সময় বিচারপতিরা উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর বিখ্যাত লাইন— “টু বি অর নট টু বি”— উল্লেখ করেন। আদালত জানায়, ভারতে প্রত্যক্ষ মৃত্যু বা অ্যাকটিভ ইউথানেশিয়া সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে প্যাসিভ ইউথানেশিয়ার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
হরীশ রানার ক্ষেত্রে দু’টি বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে বলে আদালত জানিয়েছে— তাঁর চিকিৎসার বর্তমান অবস্থা এবং রোগীর জন্য কোনটি মঙ্গলজনক। এই দুই দিক বিচার করেই নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
রায় দিতে গিয়ে ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক ‘কমন কজ় বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ মামলার প্রসঙ্গও উল্লেখ করে শীর্ষ আদালত। ওই রায়ে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার’-কে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।



